অমাবস্যায় যারা পূর্ণিমার গল্প শোনান তারা - কাক ও অন্যান্য গল্প //অনিল ঘড়াই


অনিল ঘড়াই

কাক ও অন্যান্য গল্প

তূর্য

অনিমেষ দত্ত 

অমাবস্যায় যারা পূর্ণিমার গল্প শোনান, যাঁরা দীপাবলির আলোকিত প্রদীপ এবং ডানা ভাঙা পাখির অনন্ত আকাশ-লেখক অনিল ঘড়াই তার উৎসর্গ পত্রে এভাবেই যেন অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আলোতে প্রবেশ করতে চেয়েছেন।নতুন এই দিগন্ত খোলা লেখক অনেকের কাছে এখনও অনাবিস্কৃত।'কাক' লেখকের প্রথম গল্প সংকলন।পরবর্তী কালে আরও নতুন ৫২ টি গল্প ও আরও কিছু গল্প নিয়ে মোট ৬০ টি গল্পের সংকলন রূপে প্রকাশ পায় 'কাক ও অন্যান্য গল্প।'অরণ্যের পাশাপাশি বেড়ে ওঠা বৃক্ষের মতো তার গল্পগুলিও খুঁজে পেতে চেয়েছে নিজস্ব আকাশ।সংসারের দলিত ও শ্রমজীবী পরিজনদের কথা, তাদের পেশা,সুখ-দঃখ সবই তার গল্পের প্রাণ।প্রয়াত কবি কালীপদ কোঙর এই গল্প সংকলনের তৃতীয় সংস্করণে একটি ভূমিকা লিখে লেখককে অনেকটাই সামনে এনেছেন।

সংকলনে 'কাক' গল্পটি প্রতীকের আঙ্গিকে সমাজের অবক্ষয়ের কথায় সামনে আনে।গল্পে লেখক লিখছেন 'গঙ্গার বাতাস নাকে এলে মড়া পোড়ানোর আঁশটে গন্ধ পাই।হাওয়ায় গাছের শাখা প্রশাখা নড়লে মনে হয়,ওরা ষড়যন্ত্র করার জন্য ঈশারা করে ডাকছে।'

এভাবেই লেখক গল্পের পরতে পরতে প্রতীকের সুন্দর ব্যবহার করেছেন।শেষে গল্পের নায়ক প্রার্থনা করে 'প্রভু,আমাকে কাক করে দাও'যাতে এই ঝাড়ুদার পাখির মতো সেও সামাজিক আবর্জনাগুলিকে খেয়ে ফেলে পরিবেশকে পরিস্কার রাখতে পারে।

'ঘাসমুখ'গল্পে যেমন দেখতে পাওয়া যায় সুষমার সংসার জীবন তেমনি দেখা যায় বোবা ঝুমুরের কান্নার শব্দ।এসব কান্না শিশিরের মতো নীরবে বিচরণ করে।


কাক ও অন্যান্য গল্প -অনিল ঘড়াই


 ভোরবেলার বাতাসে কেমন শীত শীত গন্ধ।এরকম আবহ তৈরী হয়ছে 'কালকেতু'-র মতো গল্পে।ডাক্তার রাত্রি যেভাবে নিজের ভালোবাসাকে পাবার জন্য অপরের ক্ষতি করার চেষ্টা করে নিজের ডাক্তারি বিদ্যার অপপ্রযোগ ঘটায়।এরকম জঘন্য কর্মের কথাও উঠে এসেছে 'রাত্রি' গল্পে।কালীপদ কোঙরের কথায় বলা যায় গল্পে দেহমিলনের মতো স্বাভাবিক ব্যাপার প্রচুর আছে কিন্তু বর্ননা ইঙ্গিতবহ ও সংযত।'ভূমিপুত্র'-এ যেমন উঠে আসে নৌসাদের ব্যাথা তেমনি 'সর্বংসহা'তে অর্নবের হাসি।দীঘা-মেদিনীপুর প্রভৃতি জেলার আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বার বার উঠে আসে তার গল্পে।অাঞ্চলিক শব্দগুলো শব্দবন্ধের মতো ব্যবহার হয় জ্যোৎস্নার উত্তাপ,অরন্যে একাকী,অমলেন্দু ভালো আছো ইত্যাদি গল্পে।

'গল্পের জলছবি' গল্পে হাসপাতালের বেডে শুয়ে ডি.এল রায়ের সেই বিখ্যাত উক্তি সত্যি সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ এমন কথাও মনে হয়।

নদীর কথা,মানুষের কথা,শহরের কথা,জীবনের কথা, সমাজের কথা সবেতেই অনিল ঘড়াই যেন বাস্তবের জলছবি এঁকেছেন।ভালোবাসা,আব্দার যেমন গল্পগুলিতে ফুটে ওঠে তেমনি কখনও আড়ালে থেকে কোন চেনা মানুষ অচেনাকে চালিয়ে নিয়ে যায়।

'ফেরা'গল্পে যেন স্মৃতির পাখি ডানা ঝাপটায় সেই পাখি আবার কোথাও 'রোদ্দুর' হয়ে ছেলের দিব্যিতে ভয় পায়।বাবুর হুকুমে 'ঘরের মানুষ' কখনও পরের মানুষ হয়ে যায় 'বিদ্যুৎলতা' গল্পে।

জায়গা দখলের লড়াই দেখা যায় 'আলোর ভুবন' গল্পে।পম্পা,মালতী প্রভৃতি নারী হৃদয়ের কথা উঠে আসে কোটাল ও জলপোকা গল্পে।

শুকনো ফুলের মালার মতো গল্পের নামকরন ও বিষয় বৈচিত্রেও গল্পগুলি সরস।

অপর্না নিজের 'প্রথম গর্ভ' -এ পাপের ছায়া দেখেছে।মলিন হয়েছে সমাজ বাস্তবতার রূঢ় দিক।স্বপ্নের ডিঙা, কোলভরা করে আসে তাঁতশালের সুতোর মতো।

'খরাভূমি' গল্পে মুন্না যেন শেফালির ঘুমের মতো আচ্ছন্ন।লোডসেডিং এর সময় জু 'নেওয়া বারণ এরকম ভাষার প্রযোগ দেখা যায় 'পদযুগল' গল্পে।

মেঘ পলাতক,'শূণ্যতার সীমারেখা' প্রভৃতি প্রতিটি গল্পেই ভিন্ন শিল্পিত ব্যাকরণের স্বাদ পাওয়া যায়।চৈতীর 'বকুল বাগান' মন জয় করে নেয়,স্বাদ এনে দেয় ভিন্ন ভাবধারার।চোরাকুঠুরীতে এ হেন 'স্বাধীনতার স্বাদ' গল্পের মতো সদা চঞ্চল যেন এক 'মরা জ্যোৎস্নার বিকেল।'

দিলবাহার লাফিয়ে ওঠে,আতর বুঝলি আতরের সুবাস,আমার বাপজানের সুবাস এভাবেই যেন 'ডাহুক বিদ্রোহের উপসংহার' টানা হয়েছে গল্পে।

সাড়ে চারশো পৃষ্ঠার কিছু বেশী এ গল্প সংকলন মনের মধ্যে আলাদা ভরকেন্দ্র তৈরী করে।

গল্পের অভিমুখ বারবার বদলে যায় কখনও বা সমান ভাবে এগিয়ে চলে।কখনও গল্পের শেষ মোড় নেয় চরম বাস্তবতার দিকে।এভাবে প্রখর বাস্তববাদী,মানবদরদী লেখক শব্দের তুলিতে অনবরত প্রতিটি গল্পে চিত্রায়িত করেছেন।


Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্রের অত্যাচার কেবলমাত্র জেলের বাইরে নয় জেলের ভিতরেও - নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কথাসাহিত্য//ফটিক চাঁদ ঘোষ

প্রবন্ধের আলোচনায় লেখকদের উপন্যাস ও গল্পের তালিকা ও - বাংলা কথা সাহিত্যের খোঁজে // সালেহা খাতুন

শ্রাবণময় আকাশভাঙা চোখে - নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কবিতা // ফটিক চাঁদ ঘোষ