রাষ্ট্রের অত্যাচার কেবলমাত্র জেলের বাইরে নয় জেলের ভিতরেও - নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কথাসাহিত্য//ফটিক চাঁদ ঘোষ
নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কথাসাহিত্য
ফটিক চাঁদ ঘোষ
বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ
অনিমেষ দত্ত
"আরওয়ালের অড়হর খেতের পাশে পড়েছিল ভরত শাহুর লাশ/সমীর আর স্বপন পড়েছিল কাশীপুর নর্দমার ধারে/বারাসাতের ঘাসজ্বলা মাঠের উপর অজয় ছিল,সুমিত ছিল হাতের মুঠো করে মরে/অহল্যা মরেছিল কাকদ্বীপে তাই নকশালবাড়িতে সনকা চিৎকার করল/সনকাও মরেছিল…."
স্বপ্নময় চক্রবর্তীর 'আরওয়ালের হাত' গল্পের একটি কবিতার অংশ এটি।এই কবিতায় যেন রক্তাক্ত নকশাল আন্দোলনের ভাষা রচনা করেছে।সেই ভাষার মতোই লেখকের এই গবেষণা গ্রন্থ-'নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কথা সাহিত্য।' নকশাল আন্দোলন পরিপূর্ণ অর্থে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন যা চ্যালেঞ্জ করেছিল রাষ্ট্রকে।
সমগ্র দেশের মানুষের বৈপ্লবিক সমাজ রূপান্তরের ভাবনা ও স্বপ্নের নতুন দিশা দেখাতেই এই আন্দোলনের সৃষ্টি।
লেখক স্বীকার করেছেন রাজনৈতিক উপন্যাস নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে স্বল্পতা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।রাজনীতির সঙ্গে জীবনের এবং জীবনের সঙ্গে উপন্যাসের সম্পর্ক তাই উপন্যাস রাজনৈতিক উপন্যাস।হোক না কেন তার কথাগুলি অর্থহীন।
নকশাল আন্দোলন যে কারণেই স্তিমিত হয়ে যেতে পারে কিন্তু তার জিজ্ঞাসা ঘুরিয়ে দেয়া জীবনের অভিমুখ রাষ্ট্রের মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে একটি অন্য রূপ দান করে।
গ্রন্থকার নিরলস প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সেই সময়কার নানা উপন্যাসের বহু অনুসন্ধান করে সমস্ত উপন্যাস গুলি এক ছাদের নীচে উপস্থাপন করেছেন।সেখানে জীবনবোধ,সৃষ্টিশীল চিন্তা ভাবনাগুলোকে প্রস্ফুটিত করার জন্য চেষ্টা করেছেন।বক্তব্য বিন্যাসের ক্ষেত্রে নিজস্ব মূলকথা সৃষ্টি করেছেন প্রাঞ্জল ভাষায়।
কিছু কিছু যুক্তি দিয়ে আলোচ্য গ্রন্থটিতে অনেকটাই পূরণ করেছেন।রাষ্ট্র কীভাবে এ আন্দোলন স্তিমিত করেছিল তার বর্ণনা লেখক দিয়েছেন।
লেখক প্রবেশিকা অংশে স্বীকার করেছেন নকশাল আন্দোলনের পূর্ণ পরিচয়জ্ঞাপক একটি উপন্যাসও লেখা হয়নি।পরিচয় অর্থে এখানে তত্ত্ব সম্পর্কে বিষদ আলোচনা।
আলোচিত উপন্যাস ও গল্পগুলির কিছু বাজারে অপ্রাপ্য।লেখক সেই সবকিছু জোগাড় করে দুঃসাধ্য কাজটি সম্পন্ন করেছেন যা পাঠকদের ক্ষিদে অনেকটাই বাড়িয়ে দেবে। লেখক গ্রন্থের শেষে প্রায় ৬০ টিরও বেশী গল্পের তালিকা প্রস্তুত করেছেন।যেখানে ছোট গল্প,লেখক তালিকা এবং প্রকাশনা সংস্থার উল্লেখ রয়েছে।প্রধান উপন্যাস ও অপ্রধান উপন্যাস হিসেবে ভাগ করেছেন মোট ৩৩টি উপন্যাসকে।যেখানে প্রধান উপন্যাস অংশে ২৪ টি উপন্যাসের আলোচনা রয়েছে।বাকী অপ্রধান অংশে স্থান পেয়েছে। প্রধান উপন্যাস গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ,মহাশ্বেতা দেবী,কৃষ্ণ চক্রবর্তী,শংকর বসু,শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়,দিব্যেন্দু পালিত, শৈবাল মিত্র, জয়ন্ত জোয়ারদার, কিন্নর রায় প্রভৃতি। অপ্রধান উপন্যাস গুলির মধ্যে তপোবিজয় ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়,শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখযোগ্য।
এখানে লেখক কারাকথারও বর্ণনা দিয়েছেন, আলোচনাও করেছেন রীতিমত।
রাষ্ট্রের অত্যাচার কেবলমাত্র জেলের বাইরে নয় জেলের ভিতরেও তা সীমাহীন।অত্যাচার এমনই যে তা মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনে তারও প্রমাণ মিলেছে। সত্তরের দশকে জেলখানাগুলো নকশালপন্থীতে পূর্ণ ছিল এবং সেই জেলখানার কথাই চারটি বইয়ের বেশিতেও দেখা যায়নি।যদিও আরও বেশী লেখা আশা করা যায়।লেখক তা উল্লেখ করেছেন আজিজুল হকের 'কারাগারে ১৮ বছর', জয়া মিত্রের 'হন্যমান',মীনাক্ষী সেনের 'জেলের ভেতর জেল', শুভেন্দু দাশগুপ্তের(সম্পা)'জেলখানার লেখা সত্তর।'
নকশাল আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতাও লেখক উল্লেখ করেছেন।
কৃষক ও সাধারন মানুষের প্রতিরোধ নিয়ে ব্রজেন মজুমদারের 'খোদহাটির ডাক' গল্পে নকশালবাড়ির মতো কৃষকদের জমি দখলের কথা লেখক দেখিয়েছেন।মাতৃমহিমা অংশে সমরেশ বসুর 'শহীদের মা' যেমন উল্লেখ্য তেমনি ধর্মদাস মুখোপাধ্যায়ের 'দেওয়াল লিখন' গল্পও সমান ভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অংশে দিব্যেন্দু পালিতের 'মানুষের মুখ' গল্প নিয়ে লেখকের আলোচনা কিমবা সুনীল দাশের 'পারমানবিক চুক্তি'গল্প দৃষ্টি আকর্ষন করে।
পুলিশের ভূমিকা কি ছিল তা নিয়েও লেখক আলোচান করেছেন মিহির আচার্যের গল্প ও নবারুণ ভট্টাচার্যের 'খোঁচড় ' নিয়ে।
স্বপ্ন ও প্রতিবাদের আলোকে মহাশ্বেতাদেবীর 'দ্রৌপদী' গল্পটিও লেখক আলোচনা করেছেন।গ্রন্হের শেষে নকশাল আন্দোলন নিয়ে অনেক আলোচিত গ্রন্থের উল্লেখ মেলে।
'নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কথাসাহিত্য' গ্রন্থটি একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ তাই এ গ্রন্থের পাঠ প্রতিক্রিয়াতে বইটির সমস্ত অংশ সেভাবে ধরা সম্ভব নয়।তবে নকশাল আন্দোলন নিয়ে এরকম অসাধারণ আলোচনার জন্য লেখককে আলাদা ভাবে ধন্যবাদ দিতেই হয়।

Comments
Post a Comment