শ্রাবণময় আকাশভাঙা চোখে - নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কবিতা // ফটিক চাঁদ ঘোষ
নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কবিতা
ফটিক চাঁদ ঘোষ
বঙ্গীয় সাহিত্য সংসদ
অনিমেষ দত্ত
"দেখো নাকি চেয়ে/আসন্ন মৃত্যুর মুখে মহাকাল আতঙ্কে নিষ্ঠুর/অক্ষমের,দুর্বলের,নারীর শিশুর/অন্ধ ক্রোধে প্রাণ উৎপাটিছে!"-ছিন্নভিন্ন শুকনো পাতার এক কবিতা যেন মাঠের রোদ্দুরের মতো তৈরী করতে পারবে নকশাল আন্দোলনকে।আমরা দেখেছি কি গভীর এক নিদারুণ ব্যর্থতার তীব্র হাহাকারের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছিল নকশাল আন্দোলন।আন্দোলনের ব্যর্থতা বিপ্লবের ব্যর্থতা নয়।একথা বুঝেছিলেন নকশাল আন্দোলনের সময়ের কবিরা।প্রতিটি সংগ্রামই কোন না কোন আবেদন রেখে যায়।কবিতা সেই আবেদন পূরণ করে।বেদনার ব্যাথা ও মনকষ্টকে বুকে নিয়ে আশ্রয়,অবলম্বনে সেই সব কবিতা হেঁটে গিয়েছে একা একা।নকশাল রাস্তার দুধারের গোছানো সমাজ কবিতায় শেষ হয়নি।পাঠকদের সেই সব অগ্নিগর্ভ কবিতার ইতিহাসকে একসুতোই বাঁধার কাজ করেছেন লেখক ফটিক চাঁদ ঘোষ তাঁর 'নকশাল আন্দোলন ও বাংলা কবিতা' বইতে।বইটির প্রথম পর্বে সেই সময়ের আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসকে যেমন ধরা হয়েছে তেমনি দ্বিতীয় পর্বে সেই সময়ের কবিতায় নকশাল আন্দোলনের উদ্ভাসের কথা আছে।আর্থ সামাজিক পটভূমি থেকে মতাদর্শগত সংগ্রামের যেমন পরিচয় পাওয়া যায় তেমনি সমাপ্তির পথেরও উল্লেখ আছে।যেন বাসার গায়ে একটু দেওয়ালের দাগ।
যে সব কবিদের কবিতা সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন লেখক তাদের মধ্যে সরোজ দত্ত,শঙ্খ ঘোষ,বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,সরোজলাল বন্দোপাধ্যায়,মণিভূষণ ভট্টাচার্য,কমলেশ সেন,সমীর রায় প্রভৃতি।
সব্যসাচী দেব 'শহীদদের জন্য' কবিতায় লিখেছেন-"এসো,কথা বলি মৃতদের সঙ্গে/চারপাশের ক্লিন বেঁচে থাকার চেয়ে/যারা অনেক বেশী জীবিত।/এসো,ধরি সেই উষ্ণ হাত।"সমাজ বাস্তবার মাঝে লুকিয়ে থাকা রক্তের ফোটা।ঠিক কি কারনে এই এই বেঁচে থাকা তার থেকে মৃতদের সাথে কথা বলায় শ্রেয়।"তীব্র সার্চলাইটে এফোড় ওফোড় হয়ে যাচ্ছে ৫৫৬টা ফ্ল্যাট/চোখের কাছে ৪৪টা প্রিজনভ্যানের জাল/দরজায় দরজায় বুটের লাথি,বেয়নেট।" 'সনাক্তকরণ' কবিতায় পার্থ বন্দোপাধ্যায় এভাবেই চোখের সামনে আন্দোলনকে তুলে ধরেছেন।কখনও সরোজ দত্তের কবিতায় উঠে আসে লেলিন থেকে রম্যাঁ রল্যাাঁ।
যে স্বাধীনতা আনতে ছেলের বাপ জেলে গিয়েছিল সেই স্বাধীনতা আসার পরও শাড়ি পড়েও মা-কে জগদ্ধাত্রী প্রতিমার মতো লাগে না।যেন আন্দোলন মায়াকাননের ফুলের সহাস্য ভালোবাসার রূপ উঠে আসে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায়।
'শ্লোক' কবিতায় শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন,"আমি কেবল দেখেছি চোখ চেয়ে/হারিয়ে গেল স্বপ্নে দিশেহারা/শ্রাবণময় আকাশভাঙা চোখ।"
"বসন্ত হারিয়ে গেছে/খেলতে খেলতে"-সমীর রায়ের কবিতায় উঠে এসেছে এরকম সব মর্মবেদনার সুর।
নিদারুণ ব্যাথার ঝর্না মতো দলবাঁধা রাত বাঁচার আশায় এক এক করে এগিয়ে চলেছে।
"আঙুলগুলোকে বিষাক্ত করেছে/রাইফেলের কুঁদোয় থেঁতলে থেঁতলে।"সৃজন সেনের কবিতায় উঠে আসে রক্তাক্ত এক ক্ষত।লেখক এই সকল অনুসঙ্গগুলিকে বারবার মেলাতে চেয়েছেন কবিতার সূত্র ধরে।
কৌশিক ব্যানার্জি তার কবিতায় লিখেছেন "খুব খালি পেট কিছু বোঝে না/বেকার হলে কাব্য চলে না।"সমাজ বাস্তবতার চরম নজিরকেই যেন পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন কবি।
নকশাল আন্দোলনের কাব্যজগতে তৈরী হওয়া এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ধারা।এসব কবি ছাড়াও নবারুণ ভট্টাচার্য,রণজিৎ সিংহ,ধূর্জটি চট্টোপাধ্যায় ও আরো অনেক কবির কবিতা এখানে ধরা হয়েছে।
প্রত্যেক ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে।নকশাল আন্দোলনের সময়ের বিপরীত ধারার দুই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ও রাম বসুর কবিতার আলোচনাও এখানে করা হয়েছে।আলোচিত হয়েছে সমসাময়িক প্রাসঙ্গিক কিছু গ্রন্থ,পত্রিকাও।
"যদিও মৃত্যু আছে পৃথিবীতে/লোনা জল সমুদ্রের গভীরতা নিয়ে।"অনেক কবি শহীদ হয়েছিলেন এই আন্দোলনে সেই সব কবিদের কবিতা ও সেই সব অন্ধকারের অন্ধ আলো উঠে এসেছে এই গ্রন্থে।সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মালায়ালম অনুবাদ কবিতা 'কবি' তে উঠে এসেছে সেই সব জেগে থাকা আমৃত্যুজীবন।যোজন-যোজন চলতে থাকা কিছু কবিতার লাইনে তা-"লোহার গরাদের ভেতরে/এই কবি/লুঠ হয়ে গেছে তার কন্ঠস্বর/তার আবেগ অনুভূতি।"
বইটির খুব সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন অতনু গাঙ্গুলী।যেন রক্তাক্ত ধারা আন্দোলনে আলোর দলে নাম লেখানো আসন পাতা কবিতা।
উপসংহার দিয়ে এই আন্দোলন শেষ করা যায় না তাই লেখক এখানে 'উপসংহারের পরিবর্তে' একটি অংশ রেখেছেন যা সামগ্রিক দিক বিচার করে।গ্রন্থের পরিশিষ্ট অংশে কবি পরিচিতি ও সাক্ষাৎকারকে স্থান দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যেক কবিতায় যেন এই রক্তাক্ত আন্দোলনের দিনগুলিতে একই কথা বলে যা সাগর চক্রবর্তীর কবিতা 'নভেম্বর:পরিচিত বর্নমালা' কবিতায় উঠে আসে "ভালো নেই,আমরা/কেউই ভালো নেই।"
নকশাল আন্দোলন নিয়ে ইংরেজী ভাষায় অনেক বই থাকলেও বাংলা ভাষায় খুব বেশী বই নেই।যদিও এটি একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ তাই এ ক্ষুদ্র পাঠপ্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ রূপে আলোচনা করা সম্ভব নয়।

Comments
Post a Comment